রোজ সকালে ব্যাগ হাতে সব্জি বাজারে যাওয়া বাঙালির স্বভাব। শুধু স্বভাবই নয় এটা একটা বাঙালিয়ানাও বটে। কিন্তু আজকাল বাজারের পদ্ধতি অনেক বদলেছে। পাড়ার বাজারের বা পাড়ার দোকানের পরিবর্তে আমরা যাচ্ছি sopping mall এ। জামা-কাপড়, electronic জিনিস, রোজকার প্রয়োজনীয় জিনিস এমনকি আনাজপাতি কিনতেও যাচ্ছি এই সব বড়ো বড়ো দোকানে থুড়ি sopping mall এ। এ সব mall এ সুবিধাও আছে। কোন জিনিসের কত দাম আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হয় না। প্রত্যেক জিনিসের সঙ্গে price tag থাকে, সেটা দেখেই বুজে নিই কোন জিনিসের কত দাম। আবার এখনতো online sopping এর যুগ। জিনিস খোঁজো, দাম দেখো, order দাও। আচ্ছা দাম যখন আমরা দেখি তখন কি এটা খেয়াল করি যে দামগুলো বেশির ভাগই শেষ হচ্ছে 99 দিয়ে। হ্যাঁ, প্রায় প্রত্যেকটি জিনিসের দাম শেষ হয় 99 দিয়ে। কেন? কখনো কি তলিয়ে ভেবে দেখেছি? আমি দিব্যেন্দু কর্মকার আজ না জানা কথার ষষ্ঠ পর্বে জানাবো সেই কথা।
আমি একটা মোবাইল ফোন কিনবো বলে ঠিক করলাম। এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম কি ফোন কেনা যাই? সে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলো কত দামের মধ্যে কিনবো। বললাম 15000/- এর মধ্যে কিনবো। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো, "আজ তাহলে কিনিস না, কাল একটা নতুন মোবাইল launch করছে, ওটা কিনিস।" কত দাম জিজ্ঞাসা করলাম। বললো 15 হাজার। খুব ভালো। আমি ফিরে আসলাম। Internet এ search করলাম দেখলাম দারুন ফোন। কিন্তু দাম দেখে তো অবাক, 15999/-. মানে পুরো 16 হাজার। আমি এখন কোথায় পাবো বাকি এক হাজার? এদিকে ফোনটা খুব ভালো, মনে ধরে গেছে। কিনলে ওটাই কিনতে হবে। যেভাবেই হোক টাকা জোগাড় করে কিনতে হবে।
হ্যাঁ, এটাই হয় সবার। Mall এ জামা কিনতে গেছি দাম 599/-, ভেবে বসলাম 500/- টাকা। টিভি কিনতে গেছি দাম 20999/-, অর্থাৎ 19 হাজার মাত্র। একবার ভাবুন তো মোবাইলটার দাম যদি 16000/- লেখা থাকতো তাহলে কি আমি কিনতাম, বা জামাটা 600/- টাকা লেখা হতো বা টিভিটার ক্ষেত্রে যদি 21000/- টাকা লেখা হতো? তাহলে হয়তো প্রথমেই ওটাকে দাম দেখে বাতিল করে দিতাম। যেকোনো দামের পিছনে 99 লেখা হয় এই কারনেই।
এটাকে বলা হয় psychological price. আমারা লেখা পড়ি বাঁ দিক থেকে, যার ফলে দামের বাঁদিকের সংখ্যাটাই আমাদের মাথায় থাকে। আর সেই দামটাই প্রকাশ্য উচ্চারণ করে বলি। সিদ্ধান্ত নেবার সময়েও ওই বামদিকের অঙ্কটাই প্রথমে চিন্তায় আসে। আর একটা উদাহরণ দিই, একটা কম্পিউটার কিনলাম, দাম পড়লো 30685/-. যখন কাউকে আমার কম্পিউটারের দাম বলবো তখন 30 হাজারই উল্লেখ করি, 685/- টাকাটা বলি না। সেটা বলার সুবিধাতেই হোক বা মনে রাখার সুবিধাতেই হোক। একই ভাবে আমরা দোকানে কোনো কিছু কেনার জন্য গেলাম দেখলাম সেটার দাম 999/- অর্থাৎ ন'শ নিরানব্বই। কিন্তু যদি 1000/- লেখা থাকতো? ভাবতাম বাব্বা হাজার টাকা দাম। তিন অংকের সংখ্যা থেকে চার অংকে দাম পৌঁছে গেলে আমরা হয়তো সেটা না কিনেই চলে আসব।
এখন প্রশ্ন হতেই পারে, এই ভাবে তো সবাই ভাবে না। অর্থাৎ 999/- কে তো অনেকেই 1000/- ভেবে সিদ্ধান্ত নেয়। মানছি, আমি আপনি সেকথা ভাবি ঠিকই কিন্তু বাকি প্রায় 60% মানুষ কিন্তু ভাবে 900+ টাকা। যার ফলে কিছু ক্রেতাকে এই ভাবেই মোহিত করে দোকানদার।
দামের শেষে 99 লেখার এটাই একমাত্র কারণ নয়। ধরুন আপনি বড়ো এক sopping mall এ বাজার করছেন। চেনা অচেনা অনেক লোক আছে চারদিকে। আপনি 1999/- টাকার কিছু কিনলেন। আপনি অবশ্যই 2000/- দেবেন। (খুব কম লোকই গুনে গুনে 1999/- দেবে।) Bill মেটাবার পর counter এ যিনি আছেন তিনি বলবেন যে খুচরো নেই। আপনিও "ঠিক আছে" বলে কোনো কথা না বাড়িয়ে চলে আসবেন। "আরে বাবা কত বড় জায়গা, কত লোক এর মধ্যে কি কেউ 1 টাকার জন্য ঝামেলা করে? একটা status আছে তো।" ঠিক আছে, 1 টাকাতো ছেড়েই দিলাম।
এবার একটু অন্য ভাবে ভাবুন। ধরুন একটা shopping mall যেমন Big Bazaar. Big Bazaar এর সারা ভারতে 279 এর বেশি outlet আছে (লিংকে ক্লিক করে outlet গুলির বিস্তারিত দেখে নিতে পারেন)। এখন প্রতিটা outlet এ প্রতিদিন ধরি, 80 জন করে 1 টাকা করে ছেড়ে আসে। এবার একটু হিসাব করে দেখি, 1 দিনে (279×80=) 22,320/- টাকা, 1 মাসে অর্থাৎ 30 দিনে (22,320×30=) 6,69,600/- টাকা, আর 1 বছরে অর্থাৎ 12 মাসে (6,69,600×12=) 80,35,200/- টাকা। এবার ভাবুন তো প্রতি বছর 80 লক্ষ টাকা একা Big Bazaar এ মানুষজন না ফেরৎ নিয়ে ছেড়ে আসে। এই টাকাটা Big Bazaar উপার্জন বা লাভ।আর এই উপার্জনের কোনো কোনো হিসাব নেই, TAX দিতে হয় না। অর্থাৎ সোজা ভাষায় কালো টাকা। Big Bazaar এর মতো কত mall আছে আমাদের দেশে? অর্থাৎ আপনার 1 টাকা দেশে লক্ষ লক্ষ থুড়ি কোটি কোটি কালো টাকা তৈরী করছে। আর আমরা কালো টাকা কালো টাকা করে কত আলোচনা করছি?
এবার বলতেই পারেন যে অনেকে তো চকলেট/টফি/লজেন্স ইত্যাদি দেয়। বাহ্ খুব ভালো কথা। ওই চকলেট/টফি/লজেন্স গুলো বাজারে কত করে দাম নেয় বলুনতো? বড়জোর 30-40 টাকা প্রতি 100 চকলেট/টফি/লজেন্স। মানে কম দামের চকলেট/টফি/লজেন্স বেশি দামে জোর করে বিক্রি করে 60% লাভ, যার আবার কোনো bill নেই মানে হিসাব বহির্ভুত কালো টাকা। জাগো গ্রাহক জাগো।
তাহলে কি করা যায়?খুব সাধারণ কাজ, digital ভাবে payment করুন মানে card বা বিভিন্ন app (যেমন Bhim UPI App) -এ payment করুন। যেটা আরো smart আরো standard. আর এক টাকাটা কোনো গরীব মানুষ কে দান করুন। কম করে 80 লক্ষ টাকা তো গরীব মানুষ পেয়ে যাবে। তাছাড়া সুলভ শৌচাগারেও টাকাটা খরচ করতে পারেনা। পরিবেশ দূষণটা তো বাঁচাতে পারেন, স্বচ্ছ করতে পারেন।
ফিরে আসি 99 এর কথায়। USA তে একটা সমীক্ষা করা হয়েছিল বেশ কিছু বড় sopping mall company দেড় নিয়ে। দুটো আলাদা জিনিসের দাম ছিল একই, $34 (34 ডলার)। একটি জিনিসের দাম বাড়িয়ে করে দেওয়া হলো $39, অন্যটির দাম বাড়িয়ে করা হলো $44. জিনিসের দাম বেড়েছে, বিক্রি কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রথম জিনিসটির ক্ষেত্রে সেটা হলো না। উল্টে বিক্রি সামান্য বেড়ে গেলো। অন্য দিকে দ্বিতীয় জিনিসটির ক্ষেত্রে বিক্রি অনেক কমে গেলো। প্রথম জিনিসটির ক্ষেত্রে যে দাম বেড়েছে সেটা অনেকেই খেয়াল করেনি। অর্থাৎ প্রথম জিনিসের দামের বামদিকের অঙ্কটির কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় (34 থেকে 39) কেউ সেভাবে দামবৃদ্ধি খেয়াল করেনি। কেনা বন্ধ করেনি বা কমিয়ে দেয়নি। অন্য দিকে দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে বামদিকের অঙ্কটির পরিবর্তন হওয়াতে সবাই সহজেই ধরতে পেরেছে যে দাম বেড়েছে। তাই কেনা কমিয়ে দিয়েছে।
আরও দুই ধরণের psychological price এর ব্যবহার হয়। প্রথম টি হলো whole number price দ্বিতীয়টি হলো random number price. 99 এর চালাকি অনেকেই জেনে বা বুঝে গেছে। তাই অনেক কোম্পানি তাদের দ্রব্যের দাম রাখছে whole number এ যেমন 28400/- টাকা। এরকম price tag দেখে অনেকেই ভাবে যে এই কোম্পানিগুলো দামে 99 লিখে ঠকায় না। ভালো কোম্পানি। ভালো কোম্পানির দ্রব্যও ভালোই হবে। এই ভেবে অনেকেই সেই সব কোম্পানির জিনিস কেনে। আবার অনেকে তাদের জিনিসের দাম রাখছে random number এ যেমন 28580/-, এর ফলে কারো কারো দৃষ্টি ওই সংখ্যাগুলোর দিকে যাচ্ছে, মন টানছে ওই দ্রবই কিনতে।
তাহলে এখন কি জিনিস পত্র কিনতে গিয়ে দামগুলো ভালো করে দেখবেন? কেনার সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে কি আরো একবার ভাববেন? লিখে জানাতে পারেন comment এ। এছাড়াও অন্য কোনো কিছু জানার ইচ্ছা হলে comment করে বা facebook এ বা অন্যভাবেও জানাতে পারেন, আমি তার উত্তর অবশ্যই দেব।