মিশর নামটা শুনলেই মনে আসে পিরামিডের কথা, মনে আসে মিশরের রাজা ফ্যারাওদের কথা, মনে আসে মমির কথা। রহস্যে মোরা মিশর। পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি হলো মিশরের পিরামিড। ছোটবেলা থেকেই পড়ে আসছি এই মিশরের পিরামিডের কথা। পাঠ্যবইয়ে পড়েছি ফ্যারাও এর সমাধি সৌধ হলো এই পিরামিড। আমরা কি সব ঠিক পড়েছি? যদি বলি পিরামিডের মধ্যে কোনো মমি পাওয়া যায়নি। তাহলে? আমি দিব্যেন্দু কর্মকার আজ না জানা কথার এই পর্বে নিয়ে এসেছি পিরামিডের কিছু না জানা কথা।
আজকের বিষয়বস্তু সংক্ষেপে:
পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য্য ও মিশরের রাজা ফ্যারাওদের সমাধি ক্ষেত্র হিসাবে পিরামিডের কথা আমরা সবাই স্কুলের ইতিহাস বইতে পড়েছি। কিন্তু সবথেকে আশ্চর্য্য হলো পিরামিডের ভিতর কোনো মমি বা সমাধি পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে পিরামিডের উপকরণ ও গঠনশৈলী একে wireless power station হিসাবে ভাবতে বাধ্য করে। পিরামিডের সঙ্গে ওরিয়ন বা কালপুরুষ নক্ষত্রমন্ডলীর যোগ, পিরামিডের বিভিন্ন দিকের পরিমাপের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ের সাদৃশ্য ভিনগ্রহের সভ্যতার সঙ্গে যোগাযোগের ধারণা তৈরী করে।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবে মিশরের পিরামিডের কথা আমার পাই ইতিহাস বইয়ে। সেখানকার রাজাকে বলা হতো ফ্যারাও। প্রাচীন মিশরের মানুষ মনে করতো মৃত্যুর পরেও আছে জীবন। তাই মৃত্যুর পরে তাদের দেহকে কখনো নষ্ট করা হতো না। দেহের পচনশীল অংশ বাদ দিয়ে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের সাহায্যে দেহকে সংরক্ষণ করে রাখা হতো। একে বলা হয় মমি। রাজাদের মমিকে কোনো এক গুপ্ত স্থানে রেখে দেওয়া হতো। আর সঙ্গে রাখা হতো নিত্য ব্যবহার্য জিনিস, অলংকার, অস্ত্র সস্ত্র, প্রিয় খাবার, পোশাক ইত্যাদি। এমনকি অনেকক্ষেত্রে প্রিয় পশু বা দাস-দাসীকেও উৎসর্গ করে দিয়ে দেওয়া হতোমমির সঙ্গে। এমনি বিভিন্ন ফ্যারাওদের সমাধি হলো মিশর বা ইজিপ্টের পিরামিড। খ্রিস্টপূর্ব 2630–2610 সালে তৈরি এই সব পিরামিড। হাজার হাজার মানুষ কায়িক শ্রমের বিনিময়ে 20 বছরের বেশি সময়ে গড়ে উঠেছিল এক একটি পিরামিড।
রহস্যে মোরা পিরামিড:
আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে তৈরি হয়েছিল পিরামিড। 2 টন থেকে 50 টন ওজনের প্রায় 23 লক্ষ বিভিন্ন পাথরের ব্লক তৈরি করে সেগুলো পর পর সাজিয়ে তৈরি এক একটি পিরামিড। পাথরের ব্লকগুলি এমন মসৃন ভাবে কেটে বসানো যে তার মধ্যে চুল পরিমান ফাঁকও নেই। পাথরের ব্লকগুলি পৃথিবীর অন্য যেকোনো পাথরের থেকে বহুগুন শক্ত। পাথরগুলো পাহাড় কেটে তৈরী করে বহুদূর নীলনদীর সাহায্যে বয়ে এনে উঁচুতে তোলা হয়েছিল। এই তথ্যগুলো স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের মনে বেশ কিছু প্রশ্ন তুলে দেয়। কিভাবে এতো মসৃন ভাবে পাথর কাটা হয়েছিল? কোনো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া কিভাবে এতো পাথর বয়ে এনে এতো উঁচুতে তোলা হয়েছিল? কোন জ্যামিতিক পদ্ধতিতে এতো নির্ভুলভাবে পাথরগুলিকে বসানো হয়েছিল? যে পাথরগুলি দিয়ে পিরামিড তৈরি সেই ধরণের পাথর পৃথিবীতে আর কোথাও পাওয়া যায়নি, কেন?
পিরামিড সমাধিস্থল নয়:
আমরা পড়েছি পিরামিড হলো ফারাওদের সমাধি স্থল। কিন্তু পিরামিডের মধ্যে কোনো সমাধি পাওয়া যায়নি। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। The Great Pyramid এর মধ্যে তিনটি কুঠুরি রয়েছে। যেগুলিতে কিছু কফিনের মতো জিনিস পাওয়া গেছে, কিন্তু সেগুলিতে কোনো মমি নেই। তাছাড়া ওই কুঠুরিগুলির প্রবেশ পথ এতো ছোট যে কোনো মমি ওর মধ্যে ঢোকানো সম্ভব নয়।
উপাদানের রহস্য:
বলা হয় পিরামিড লাইম স্টোন দিয়ে তৈরি কিন্তু পরীক্ষায় ধরা পড়েছে পাথরগুলি লাইম স্টোন নয় লাইম স্টোনের মতো। পাথরগুলি সাধারণ পাথরের থেকে লক্ষ গুন কঠিন। এই পাথরের কোনো প্রতিরূপ বা সমকক্ষ পাথর পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যায়নি। পাথরগুলির মধ্যে পাওয়া ডলোমাইট গুলি তড়িৎ পরিবাহী এবং বাতাসকে আয়নিত করে। পিরামিডের ভিতরে পাওয়া গিয়েছে গ্রানাইট যা উত্তম তড়িৎ পরিবাহী। বিভিন্ন কুঠুরিতে বা দোওয়ালের ফাঁকে দেখা গেছে তামার তার। পিরামিডের নীচে একদা ছিল প্রচুর জলের উৎস বা জলধারা। পিরামিডের চূড়ায় ছিল সোনার আবরণ (মনে করা হয় পরবর্তী কালে সেই সোনা চুরি হয়ে গেছে)। পুরো পিরামিড ঢাকা ছিল চুনা পাথরে যা ছিল সম্পুর্ন্ন অপরিবাহী। এই চুনা পাথরে আবরণ 1301 সালে ভূমিকম্পে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। বিদ্যুৎ তৈরির এতো উপকরণ যা দেখে পিরামিডকে এক wireless power station বলে মনে হয়। পিরামিডের নীচের জল পাথরে কৌশিক প্রক্রিয়ায় পৌছিয়ে পাথরকে আয়নিত করতো। সেই তড়িৎ চূড়া দিয়ে ছড়িয়ে পড়তো। এমনি এক wireless power station তৈরি করতে চেয়েছিলেন বিজ্ঞানী টেসলা। বাগদাদে পাওয়া বাগদাদ ব্যাটারি প্রমান করে যে প্রাচীন কালে বৈদ্যুতিক শক্তির ব্যবহার ছিল।
গিজার তিনটি পিরামিড এমন কৌণিক দূরত্বে অবস্থিত অর্থাৎ পিরামিডগুলি সরলরেখা দিয়ে যোগ করলে যে কোন উৎপন্ন হয় তাও এক রহস্য। ওরিয়ন নক্ষত্রমন্ডলী অর্থাৎ কালপুরুষ নক্ষত্রমন্ডলী সবাই চেনে। এর বেল্ট যে তিনটি তারা দিয়ে গঠিত তার কৌণিক দূরত্ব পিরামিডের কৌণিক দূরত্বের সমান। তবে কি প্রাচীন মিশর জ্যোতির্বিদ্যায় আমাদের থেকেও পারদর্শী ছিল? পিরামিডের মধ্যে এমন বেশ কিছু সুড়ঙ্গ আছে যা আরো রহস্যে মোরা। সুড়ঙ্গগুলি থেকে অসীম সরলরেখা অঙ্কন করলে তা ওরিয়ন নক্ষত্রমন্ডলীর বিভিন্ন নক্ষত্রে গিয়ে মিলিত হয়। ওরিয়ন নক্ষত্রমন্ডলীর সঙ্গে পিরামিডের এতো যোগ কেন? সেখানকার কোনো উন্নত সভত্যার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য কি পিরামিড তৈরী হয়েছিল? পিরামিডের চারটি তল পৃথিবীর চারটি দিককে সম্পূর্ণ সঠিক ভাবে নির্দেশ করে। যখন মানুষের কাছে সমগ্র পৃথিবীর ধারণাই সঠিকভাবে ছিল না তখন কিভাবে এতো নিখুঁত ভাবে দিক নির্দেশ সম্ভব ছিল। যদিও সূর্য্য ঘড়ির সাহায্যে দিকনির্দেশ সঠিক ভাবে করা যায়। কিন্তু তার জন্য অনেক হিসাব ও সময়ের সঠিক জ্ঞান থাকা দরকার। থাকা দরকার গণিত বিদ্যায় পারদর্শিতা।
পরিমাপগত রহস্য:
আমরা পৃথিবীর ম্যাপ সবাই দেখেছি। এই ম্যাপের কেন্দ্র কোনটা? ভাবলে অবাক হতে হয়, গীজার পিরামিড থেকে পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দূরত্ব সমান। আবার পূর্ব-পশ্চিমে হিসাব করলে দেখা যায় পিরামিড ঠিক মধ্যস্থলে অবস্থিত। পিরামিডের উচ্চতা হলো 485 ফুট যা কিনা পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের 100 কোটি ভাগের এক ভাগ।
রহস্যের সমাধান:
পিরামিডের রহস্যের বা উপরের প্রশ্নগুলির কোনো উত্তর বিজ্ঞান আজও সঠিক ভাবে দিতে পারেনি। যদিও কিছু প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান দিয়েছে। কিন্তু সেই উত্তর আরো অনেক প্রশ্ন তৈরি করে। এতো উন্নত প্রযুক্তি ও উন্নত চিন্তাধারার প্রয়োগ দেখে কেউ কেউ ধারণা করে যে পিরামিড মানুষের সৃষ্টি নয়। পৃথিবীর বাইরের কোনো উন্নত সভ্যতা বা আমাদেরই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম time travel করে অতীতে পৌঁছে সাহায্য করেছিল পিরামিড বানাতে।তবে তার কোনো প্রমান নেই শুধু ধারণা মাত্র।
পিরামিড নিয়ে আরো অনেক রহস্য আছে। সঙ্গে মমি নিয়েও আছে অনেক রহস্য। পিরামিডের সামনে থাকা Sphinx নিয়ে আছে প্রচুর রহস্য। সে সমস্ত রহস্য নিয়ে অন্য পর্বে আলোচনা করা যেতে পারে, যদি আপনি পড়তে ইচ্ছুক থাকেন। অবশ্যই Comment করে জানাবেন। Share করে অন্যকে জানার সুযোগ করে দেবেন।



খুব ভালো লেখা ।
ReplyDeleteমিশরীয় সভ্যতা ও মিশরের পিরামিড এর কিছু অমিমাংসিত রহস্য
ReplyDeletehttps://youtu.be/gRA3jOwACq8